আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ প্রকাশ করেছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শিরোনামে ঘোষিত এই ইশতেহারে দেশের অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও ডিজিটাল অগ্রগতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নয়টি মূল প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার উপস্থাপন করেন। দলের নেতারা জানান, এই ইশতেহার কেবল ভোটের সময়ের ঘোষণা নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি নীতিগত দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
ইশতেহারের প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে নিম্নআয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ। এ লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার আওতায় উপকারভোগীরা প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সহায়তা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাবেন। ভবিষ্যতে এই সহায়তার পরিমাণ ধাপে ধাপে বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে, যা দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে দলটি।
কৃষি খাতকে শক্তিশালী করতে বিএনপি ‘কৃষক কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকরা ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পণ্য বাজারজাতকরণের সুবিধা পাবেন। একই সুবিধা মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও প্রযোজ্য হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে মানবিক ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা গড়তে দেশব্যাপী এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে বিএনপি বাস্তব দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিড-ডে মিল’ চালুর পরিকল্পনাও ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।
তরুণ সমাজকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
এ ছাড়া খেলাধুলাকে পেশাগত পর্যায়ে উন্নীত করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় নদী ও খাল খনন, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম পেপাল চালু, ই-কমার্স হাব গঠন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
ইশতেহার ঘোষণার সময় তারেক রহমান বলেন, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইশতেহার বিএনপির ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার একটি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছে, যা ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।