ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের জগতে বিশ্বাসযোগ্যতা বড় একটি বিষয়। কিন্তু সেই আস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে আলোচনায় আসে এক চাঞ্চল্যকর প্রতারণা চক্র, যার নেতৃত্বে ছিলেন Aleksandr Zhukov। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নকল ওয়েবসাইট ও কৃত্রিম ভিজিটর ব্যবহার করে এমন একটি জালিয়াতি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, যার মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ ডলার আয় হতো।
প্রথম দিকে এই কার্যক্রমকে একটি সাধারণ ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবসা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। Media Methane নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড যেমন Nestlé, Comcast এবং The New York Times এর বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে বলে দাবি করা হতো। কিন্তু তদন্তে উঠে আসে, এসব কার্যক্রমের বড় অংশই ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া।
ঝুকভ ও তার টিম জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ও ওয়েবসাইটের আদলে হাজার হাজার নকল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। ESPN, CNN, Vogue এবং Fox News-এর মতো সাইটের নকল সংস্করণ ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করা হতো। এসব সাইটে প্রকৃত কোনো ব্যবহারকারী না থাকলেও বিজ্ঞাপনদাতাদের দেখানো হতো বিপুল দর্শকসংখ্যা।
এই প্রতারণার মূল শক্তি ছিল প্রযুক্তি। তদন্তে জানা যায়, হাজার হাজার সার্ভার এবং অসংখ্য আইপি ঠিকানা ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম ট্রাফিক সিস্টেম তৈরি করা হয়েছিল। বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে এই ট্রাফিককে বাস্তব মানুষের আচরণের মতো করে দেখানো হতো যেমন মাউস নড়াচড়া, স্ক্রল করা কিংবা বিজ্ঞাপনে ক্লিক করা। ফলে বিজ্ঞাপনদাতারা বুঝতেই পারতেন না যে তারা ভুয়া ভিউয়ের জন্য অর্থ দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অ্যাড ফ্রড বা বিজ্ঞাপন প্রতারণা ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের জন্য বড় হুমকি। কারণ, এখানে ভিউ ও ক্লিকের মতো সূচকগুলো সহজেই ম্যানিপুলেট করা যায়, যা পুরো শিল্পের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এক পর্যায়ে একটি ক্লায়েন্টের সঙ্গে বিরোধের জেরে অতিরিক্ত ভুয়া ট্রাফিক তৈরি হলে বিষয়টি নজরে আসে সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর। ধীরে ধীরে তদন্ত এগোতে থাকলে পুরো নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এতে জড়িতদের শনাক্ত করে।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে বুলগেরিয়ায় গ্রেপ্তার হন ঝুকভ এবং পরে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২১ সালে তাকে জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আদালতে নিজের পক্ষে ঝুকভ দাবি করেছিলেন, তিনি কেবল একটি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি তৈরি করেছিলেন, যা বিজ্ঞাপন শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে আদালত তার এই যুক্তি গ্রহণ করেনি এবং পুরো কার্যক্রমকে পরিকল্পিত প্রতারণা হিসেবে বিবেচনা করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধ নয়; বরং ডিজিটাল বিজ্ঞাপন খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার একটি বড় উদাহরণ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভিউ, ক্লিক ও ব্যবহারকারীর আচরণ যাচাই করা কঠিন হওয়ায় এমন প্রতারণা সহজেই ঘটতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন উন্নত যাচাইব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর। কারণ, ডিজিটাল অর্থনীতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এমন প্রতারণা প্রতিরোধ করা এখন সময়ের দাবি।