বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) শুরুর আগে যে দলটিকে নিয়ে ছিল সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা, সেই চট্টগ্রাম রয়্যালসই এখন টুর্নামেন্টের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগের দিন মালিকানা পরিবর্তন, কোচিং কাঠামোয় রদবদল এবং টিম ডিরেক্টর নিয়োগ—সব মিলিয়ে যে দলকে অনেকেই পিছিয়ে পড়া এক ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে দেখেছিলেন, তারাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
চট্টগ্রাম রয়্যালসের এই নাটকীয় উত্থানের পেছনের গল্প উঠে এসেছে টিম ডিরেক্টর ও সাবেক জাতীয় অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের কথায়। তিনি জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় দলের ভেতরের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ অগোছালো। খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিল সংশয়, বিদেশি ক্রিকেটারদের পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা, আর প্রস্তুতির সময় ছিল প্রায় নেই বললেই চলে।
হাবিবুল বাশারের ভাষ্য অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন হঠাৎ করেই তাকে টিম ডিরেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে সময় তিনি নিজেও ভাবেননি যে এই দল মাঝপথে এসে শীর্ষে থাকবে। বরং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হিসেবে তার ভাবনায় ছিল কয়েকটি ম্যাচ জিততে পারলেই সন্তুষ্ট থাকা। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন খেলোয়াড়দের মানসিক দিকটিতে।
তিনি জানান, প্রথম কাজ ছিল ক্রিকেটারদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। কে আসবে, কে আসবে না—এই আলোচনা থেকে বের করে এনে সবাইকে একটি বার্তাই দেওয়া হয়, “এই দলটাই আমাদের, এই দল নিয়েই লড়াই করতে হবে।” প্রথম ম্যাচে জয় পাওয়ার পর সেই বিশ্বাস আরও শক্ত হয়। খেলোয়াড়রাও বুঝতে শুরু করে যে, সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও দল হিসেবে ভালো করা সম্ভব।
বিদেশি ক্রিকেটার সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল চট্টগ্রামের জন্য। আইএল টি-টোয়েন্টি শেষ হওয়ার অপেক্ষা করলে ভালো খেলোয়াড় পাওয়া যেত, তবে ততদিনে অনেক ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি ছিল। তাই যাদের পাওয়া গেছে, তাদের নিয়েই ঝুঁকি নিতে হয়েছে। কিছু ক্রিকেটার খুব অল্প প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছেন, যা আদর্শ পরিস্থিতি না হলেও দলের প্রয়োজনে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
দলের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন অধিনায়ক শেখ মেহেদি হাসান। জাতীয় দলে সীমিত অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতা থাকলেও বিপিএলে তার নেতৃত্ব নিয়ে শুরুতে প্রশ্ন ছিল। তবে মাঠের ভেতরে বোলিং ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতায় তিনি নজর কাড়েন। হাবিবুল বাশারের মতে, মাঠের বাইরে যেমন পরিকল্পনা হয়েছে, মাঠের ভেতরে সেটার বাস্তবায়নে মেহেদির অবদান অনেক।
বিসিবির ব্যবস্থাপনায় দল পরিচালিত হওয়ায় আর্থিক নিশ্চয়তাও খেলোয়াড়দের মানসিক চাপ কমিয়েছে। পারিশ্রমিক নিয়ে দুশ্চিন্তা না থাকায় ক্রিকেটাররা পুরো মনোযোগ দিতে পেরেছেন খেলায়। যদিও বড় বাজেটের তারকা আনার সীমাবদ্ধতা ছিল, তবু দলীয় পারফরম্যান্সেই ভরসা রাখা হয়েছে।
এই সাফল্যের গুরুত্ব এখানেই যে, বিপিএলের মতো প্রতিযোগিতায় শুধু বড় নাম বা বাজেট নয়, সঠিক পরিকল্পনা, মানসিক দৃঢ়তা এবং দলগত বিশ্বাসও যে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে—চট্টগ্রাম রয়্যালস তার বাস্তব উদাহরণ। টুর্নামেন্টের বাকি পথ এখনও কঠিন, তবে অগোছালো শুরু থেকে শীর্ষে ওঠার এই যাত্রা ইতোমধ্যেই বিপিএলের অন্যতম আলোচিত গল্প হয়ে উঠেছে।
