এলপিজি সংকটে জনভোগান্তি চরমে, দ্রুত সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি

এলপিজি সংকট, গ্যাসের দাম, জ্বালানি খাত, বিইআরসি, ভোক্তা দুর্ভোগ, বাজার ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি বিভাগ

lpg-crisis-public-suffering-market-management

দেশে পাইপলাইনের গ্যাস–সংযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার পর রান্নার প্রধান জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই এখন এলপিজি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ঘিরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বাজারে এলপিজির সরবরাহ ও দামে যে বিশৃঙ্খলা চলছে, তা স্পষ্টভাবে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই তুলে ধরছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) যেখানে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা, সেখানে অনেক জায়গায় তা বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুণের কাছাকাছি দামে। কোথাও আবার বেশি দাম দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। রান্নার মতো মৌলিক প্রয়োজনে এমন অনিশ্চয়তা জনজীবনে বড় ধরনের দুর্ভোগ তৈরি করছে।

এলপিজি ব্যবসায়ীদের সাম্প্রতিক ধর্মঘট বিইআরসির আশ্বাসে প্রত্যাহার করা হলেও বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব তেমন দেখা যায়নি। ধর্মঘটের আগে ব্যবসায়ীরা কমিশন বাড়ানো এবং অভিযান বন্ধের দাবি তুললেও ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। খুচরা বিক্রেতাদের বক্তব্য, তাঁরা নিজেরাই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনছেন, ফলে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। এই সরবরাহ চেইনের কোথায় গলদ তৈরি হচ্ছে, তা নির্ধারণ করে ব্যবস্থা নেওয়া এখন জরুরি।

সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি বিভাগ দেরিতে হলেও কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব, এলসি খোলার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আমদানির সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তগুলো ইতিবাচক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে আমদানিতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা এবং উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার কার্যকর হলে এলপিজির দাম কিছুটা সহনীয় হতে পারে। তবে আমদানিকারকদের আশঙ্কা, সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে। এই সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষ কীভাবে চলবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।

এদিকে প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান কিছু ক্ষেত্রে জরিমানা ও শাস্তি দিলেও বাজারের মূল সংকট, অর্থাৎ সরবরাহ ঘাটতি, থেকেই যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বাণিজ্য দ্বন্দ্বের কারণে পরিবহন ও আমদানিতে প্রভাব পড়ছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে এলপিজির বড় আকারের সরকারি মজুত না থাকায় সরবরাহে সামান্য চাপ পড়লেই সংকট তৈরি হয়। বিশ্ববাজারে দামের ওঠানামার অজুহাতে আমদানিকারকেরা বড় মজুত গড়ে তুলতে আগ্রহী নন। এই সুযোগে কিছু অসাধু সিন্ডিকেট বাজারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। জ্বালানির মতো সংবেদনশীল খাত পুরোপুরি বেসরকারি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল রাখা কতটা নিরাপদ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। রাষ্ট্রীয় কোম্পানির সক্ষমতা বাড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য সরকারি বাফার স্টক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি সংকটের স্থায়ী সমাধান শুধু ভ্যাট কমানো বা ধর্মঘট প্রত্যাহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা। আমদানির অনুমতি দ্রুত দেওয়া, এলসি খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি চালানো এখন সবচেয়ে জরুরি। সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের চুলা যেন বন্ধ না হয়ে যায়—এই দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ সরকারের নেই। 

Post a Comment