মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য সংলগ্ন বাংলাদেশ সীমান্তে চলমান সশস্ত্র সংঘর্ষের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের ভেতরে। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইকং ইউনিয়নে মিয়ানমারের দিক থেকে ছোড়া একটি বিপথগামী গুলিতে এক বাংলাদেশি কিশোরী আহত হয়েছে। ঘটনাটি সীমান্তবর্তী জনপদে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হোয়াইকং ইউনিয়নের বিপরীতে মিয়ানমারের তোতার দ্বীপ এলাকায় গত রাত প্রায় ১১টা থেকে আজ সকাল ১০টা পর্যন্ত আরাকান সেনাবাহিনী ও একটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলে। ওই সময় সীমান্তের ওপার থেকে টানা গুলিবর্ষণ ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সংঘর্ষ চলাকালেই মিয়ানমারের দিক থেকে ছোড়া একটি গুলি সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ অংশে এসে পড়ে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হোয়াইকংয়ের তেসরি ব্রিজ এলাকার একটি বাড়ির সামনে খেলছিল ১২ বছর বয়সী আফনান নামের ওই কিশোরী। সে সময় বিপথগামী গুলিটি তার কানে আঘাত করে। এতে সে গুরুতর আহত হয়। প্রথমদিকে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশ পরে নিশ্চিত করেছে যে শিশুটি জীবিত রয়েছে এবং চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) অলোক বিশ্বাস জানান, “প্রাথমিকভাবে মৃত্যুর যে তথ্যটি ছড়িয়েছিল, সেটি সঠিক নয়। শিশুটি আহত হয়েছে, গুলি তার কানে লেগেছে।” তিনি আরও জানান, ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা তৎপর রয়েছে।
এ ঘটনার খবরে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় কিছু মানুষ টেকনাফ মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভ করে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করে এবং সঠিক তথ্য জানায়।
সীমান্তে চলমান সংঘর্ষের কারণে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলেও নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এএসপি অলোক বিশ্বাস জানান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৫ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। তাদের পরিচয় যাচাই ও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
হোয়াইকং ইউনিয়নের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, গত দুই থেকে তিন দিন ধরে সীমান্তের ওপারে থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তবে গত রাত থেকে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে সীমান্তঘেঁষা এলাকার অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এই ঘটনার গুরুত্ব এখানেই যে, প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ কীভাবে সরাসরি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, তার একটি বাস্তব উদাহরণ এটি। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা, ভুল তথ্য প্রতিরোধ এবং আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয় এখন স্থানীয় প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।